দাদনের গ্যাঁড়াকলে জেলেরা


দাদনের ভয়াবহ গ্যাঁড়াকলে পড়ে আছে বরগুনার দুই উপজেলার ১৪ হাজার ৬৮৯ জন ইলিশ জেলের জীবন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম দারিদ্র্যের শেকলে বাঁধা তাঁরা। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের দারিদ্র্যের কশাঘাতের সুযোগ নিচ্ছেন দাদন ব্যবসায়ীরা। দাদনের কারণে ইলিশের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত তাঁরা। দাদন ব্যবসায়ীদের জিম্মি ও দাদনের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে সরকারিভাবে সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এসব জেলে।
জেলেদের দাবি, সরকারিভাবে তাঁদের জাল ও নৌকা বিতরণ করা হোক। মৎস্য কর্মকর্তা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মনিটরিং পলিসিতে কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ আছে কিন্তু জেলেদের জন্য কোনো ঋণ নেই। কৃষিঋণের আওতায় জেলেদের আনা হলে তারা দাদনের গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্তি পেত। জেলেদের দাদন থেকে মুক্তি দিতে সরকারিভাবে ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
জানা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চল আমতলী ও তালতলী উপজেলায় ১৪ হাজার ৬৮৯ জন নিবন্ধনধারী জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে আমতলীর ৬ হাজার ৭৮৯ এবং তালতলীর জেলে ৭ হাজার ৯০০ জন। এরা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। বংশপরম্পরায় তাঁরা এ পেশা ধরে রেখেছেন। সারা বছর মাছ শিকার করেই চলে তাঁদের সংসারজীবন।
জেলেরা বলছেন, নদী ও সাগরে মাছ ধরা পড়লে ভালো চলে তাঁদের জীবনকাল। আর মাছ ধরা না পড়লে উনুনে পাতিল ওঠে না। জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে তেমন শিক্ষা নেই। ফলে দাদন ব্যবসায়ীদের হাতে অতি সহজে তাঁরা জিম্মি হয়ে যান। উপকূলীয় অঞ্চলের গভীর সাগরে, সাগরের কিনারে এবং সাগরের শাখা-প্রশাখা নদীতে তিন শ্রেণির জেলে মাছ শিকার করেন। জেলেদের নদী ও সাগরে মাছ শিকার করতে প্রয়োজন জাল, নৌকা, ট্রলার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। কিন্তু জাল, নৌকা ও ট্রলার তৈরিতে প্রয়োজনীয় টাকা অধিকাংশ জেলের হাতে থাকে না। তখনই তাঁরা দাদন ব্যবসায়ীদের দ্বারস্থ হন। দাদন ব্যবসায়ীদের দ্বারস্থ হলেই তাঁদের হাতে জেলেরা জিম্মি হয়ে পড়েন। জেলেদের সংসার চলুক আর নাই চলুক আসল টাকা রেখে ব্যবসার টাকা তুলে নেন দাদন ব্যবসায়ীরা।
দাদন ব্যবসায়ীদের মর্জির ওপর চলে জেলেদের সংসারজীবন—এমন অভিযোগ জেলে ইসমাইল ও মাসুম তালুকদারের।
জেলে ছত্তার, লাল মিয়া ও মোস্তফা হাওলাদার বলেন, ইলিশের ভরা মৌসুম আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাস। এই চার মাসে চলে দাদন ব্যবসায়ীদের রমরমা বাণিজ্য। দাদনের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন জেলেরা। কেজিপ্রতি ইলিশের মূল্য ৫০-১৫০ টাকা কমিয়ে দেওয়া হয় জেলেদের। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই দাদনের টাকা ফেরত দিতে চাপ দেয় দাদন ব্যবসায়ীরা।
তালতলী উপজেলার গাবতলী এলাকার জেলে ছত্তার বলেন, ‘গত বছর দুই ফার (৯০০ হাত) জাল ও নৌকা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় তৈরি করেছি। ওই টাকা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে এনে পরিশোধ করতে হয়েছে। দাদনের টাকা আনা মানেই দাদন ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি। তাঁরা যেমন ইলিশের দাম নির্ধারণ করে দেন, তেমনই নিতে হয়। এতে আমরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। সরকারিভাবে জেলেদের জাল ও নৌকা বিতরণ করা হলে জেলেরা দাদন ব্যবসায়ীদের জিম্মি থেকে মুক্তি পেত।’
লাল মিয়া বলেন, ‘৮০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে এক ফার জাল-নৌকা তৈরি করেছি। গত পাঁচ বছরেও এ টাকা পরিশোধ করতে পারিনি।’
আমতলী গুলিশাখালী ইউনিয়নের নাইয়াপাড়া গ্রামের শামিম, আমানুল ও নাশির মাদবর বলেন, দাদন ছাড়া জেলেদের জীবন চলে না। প্রত্যেক জেলেরই কিছু না কিছু দাদন থাকে।
একই এলাকার নাঈম বলেন, ‘১০ বচ্ছর ধইরা জাল-নৌকা দিয়া ইলিশ মাছ ধরছি। আইজ পর্যন্ত দাদনের টাহা শ্যাষ হরতে পারি নাই। কবে শ্যাষ হরমু হেইয়্যা কইতে পারি না।’
নাইয়াপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ সৈয়দ আকন বলেন, ‘ইলিশ মাছ ধরতে ধরতে বুড়া অইয়্যা গ্যালাম কিন্তু দাদন শ্যাষ হরতে পারলাম না। শ্যাষ হরতে পারমু কিনা জানি না। সরহার যদি মোগো জাল-নৌকা বানাইয়্যা দিতো হ্যালে আর মহাজনদের ধারে যাইতে অইতো না। মোরা সরহারের কাছে জাল-নৌকার দাবি হরি।’
তালতলীর ফকিরহাট মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের মৎস্য সমিতির সাধারণ সম্পাদক দাদন ব্যবসায়ী মজিবর ফরাজী জেলেদের জিম্মি রাখার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘লাখ লাখ টাকা খাটিয়ে সারা বছর জেলেদের পাশে থাকি। যখন মাছ ধরা পড়ে তখন কিছু কিছু কেটে রাখা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘দাদন ছাড়া কোনো জেলে নদীতে মাছ শিকারে যেতে পারে না।’
ফকিরহাট মৎস্য সমিতির সহসভাপতি ইউপি সদস্য মো. ছালাম হাওলাদার বলেন, অধিকাংশ জেলেই দরিদ্র। দাদন ছাড়া জেলেরা চলতে পারে না। জাল-নৌকাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরিতে যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন, ওই টাকা জেলেদের কাছে থাকে না। তাই বাধ্য হয়েই দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে যেতে হয়।
আমতলী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তন্ময় কুমার দাস বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মনিটরিং পলিসিতে কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ আছে কিন্তু জেলেদের জন্য কোনো ঋণ নেই। কৃষিঋণের আওতায় জেলেদের আনা হলে তারা দাদনের গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্তি পেত। জেলেদের দাদন থেকে মুক্তি দিতে সরকারিভাবে ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
ক্রাইম জোন ২৪