ফাঁকা মাঠেও বিএনপিতে ৪ ভাগ


পটুয়াখালীর চারটি আসনের মধ্যে বাউফল (পটুয়াখালী-২) আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ। একবারই (২০০১ সালে) বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শহিদুল আলম তালুকদার। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপি বারবার হোঁচট খেয়েছে।
চারজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে তিনজনই কেন্দ্রীয় নেতা। ইতিমধ্যে তাঁরা মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এ ছাড়া চার ভাগে বিভক্ত হয়ে সভা, সমাবেশও করছেন। একে অপরের বিরুদ্ধে চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি। তবে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বলছেন, এবার ভিন্ন কিছু চাই। তাঁদের ভাষায়, ভবিষ্যতের রাজনীতি অতীতের মতো নয়, নতুন ধারার রাজনীতি হবে। আওয়ামী লীগের আধিপত্যের আসনে জিততে হলে বিএনপিকে অবশ্যই একজন ক্লিন ইমেজের প্রার্থী দিতে হবে।
মনোনয়নপ্রত্যাশী চারজন হলেন সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল আলম তালুকদার, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মু. মুনির হোসেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম ফারুক আহমেদ তালুকদার এবং কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান লিটু।
জানা গেছে, বাউফলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৭৯ সালে দলীয় প্রার্থী অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান নিজেদের নেতাদের বিরোধিতার কারণে। ১৯৯১ সালেও একই ঘটনা ঘটে। ১৯৯৬ সালে দলীয় নেতা-কর্মীরা বিভক্ত হলে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী। শুধু ২০০১ সালের নির্বাচনে শহিদুল আলম তালুকদার ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হলে উপজেলা বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামে এবং আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে প্রথমবারের মতো বিএনপি বিজয়ী হয়। কিন্তু এরপর আবার শুরু হয় বিভাজন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শহিদুল নির্বাচন করতে না পেরে বিএনপির প্রার্থী ফারুক তালুকদারের বিরোধিতা করেন। এতে নৌকা মার্কার প্রার্থী সহজেই জয়ী হন।
স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদার একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়ে জিতলেও তাঁর কর্মকাণ্ডে দলের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধর, নারী কেলেঙ্কারি, দলীয় নেতা-কর্মীদের হেনস্তাসহ নানা অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে অস্ত্র ও ত্রাণ লুটপাটের মামলায় দণ্ডিত হন তিনি। এর ফলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। বয়সের ভারে এখন ন্যুব্জ হলেও আবার মনোনয়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
জানতে চাইলে শহিদুল আলম তালুকদার বলেন, ‘আমি বরাবরই চেষ্টা করেছি বিএনপিকে ভালো কিছু দেওয়ার জন্য।’ মনোনয়নের সিগন্যাল পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারেক রহমান সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন। এবং আমাকে কাজ করতে বলেছেন। আর তো কাউকে ডাকেননি, অবশ্যই আমাকে মনোনয়ন দেবেন, তাই হয়তো ডেকেছেন।’
এদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম ফারুক আহমেদ তালুকদার। তিনি প্রায় ৫৮ হাজার ভোট পেলেও সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুলের বিরোধিতার কারণে হেরে যান। পরে তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন এবং কিছু সময় পর্যন্ত নেতৃত্বও দেন। তবে আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তিনি ঢাকায় সরে যান। তিনিও মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ডাকসুর সাবেক মিলনায়তন সম্পাদক ও বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মু. মুনির হোসেনকে এখন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা নতুন ভরসা হিসেবে দেখছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাউফলে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। জানতে চাইলে মু. মুনির হোসেন বলেন, ‘বাউফল বিএনপির দুর্গ। বিএনপির নেতা-কর্মীরা মূলধারার সঙ্গে রয়েছে। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, সবাই ধানের শীষের জন্য কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে সবাই ঐক্যবদ্ধ। মনোনয়ন যে কেউ চাইতে পারে, তার মানে বিভক্তি বা বিরোধ না। ইনশা আল্লাহ আগামী নির্বাচনে পটুয়াখালী-২ আসন আমরা বিএনপিকে উপহার দিব।’
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান লিটু পটুয়াখালী কৃষি কলেজের সাবেক ভিপি। বর্তমানে কৃষক দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে গণসংযোগ করছেন। তবে স্থানীয় পর্যায়ে তিনি তুলনামূলক নতুন মুখ। লিটু বলেন, ‘এ আসন আওয়ামী লীগের না, এ আসন বিএনপির। প্রতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে ষড়যন্ত্র করে হারিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হবে বিএনপি। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে এখন কেন্দ্রীয় রাজনীতি করছি। দলের দুঃসময়ে নেতা-কর্মীদের পাশে যেভাবে ছিলাম, এখনো আছি, সামনেও থাকব।’
সার্বিক বিষয়ে বাউফল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল জব্বার মৃধা বলেন, বাউফল বিএনপির ঘাঁটি। তবে আওয়ামী লীগ এ আসনে ফ্যাসিবাদী রাজত্ব করে গেছে। নির্বাচনে জয়লাভ করতে হলে প্রার্থীকে সব দিক থেকে যোগ্য হতে হয়। নয়তো শুরুতেই হারতে হয়।
ক্রাইম জোন ২৪